বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবী

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবী

0 337

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর আরোপিত ৭.৫% ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবী জানিয়েছে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি। গত ১১ আগষ্ট ২০১৫ এ জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবী জানানো হয়। বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেনের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল বেনজীর আহমেদ,ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ড.আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শেখ কবির হোসেন বলেন,
বাংলাদেশে বর্তমানে সাড়ে চার লাখেরও বেশী শিক্ষার্থী ৮৩ টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়ন করছে এবং এসব শিক্ষার্থীর ৭০% ভাগই নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের পরিবারের সন্তান। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদেরই শিক্ষার সকল ব্যয়ভার বহন করতে হয়। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নের সুযোগ থাকার ফলে বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থী বিদেশে না যেয়ে দেশেই অধ্যয়ন করছে, ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হচ্ছে। অধিকন্তু, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বিনা বেতনে এবং  মেধাবী, দরিদ্র ও অন্যান্য শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা বৃত্তিসহ স্বল্প ব্যয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিয়ে থাকে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অর্জিত যৎসামান্য আয় যা থাকে তা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সামগ্রিক উন্নয়নসহ ক্যাম্পাস নির্মাণে ব্যয় হয়ে থাকে। যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সরকার কর্তৃক ভর্তূকী/অনুদান পেয়ে থাকে সেখানে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সরকার কর্র্তৃক কোনপ্রকার আর্থিক সহযোগীতা বা ভর্তূকী পায় না, বরঞ্চ বাড়ীভাড়া ও অন্যান্য সকল আয়ের উপর উৎস কর কর্তন করা হয়। যা সম্পূর্ণ বৈষম্যমুলক আচরণের শামিল। তার উপর সরকার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের উপর ১৫% কর্পোরেট ট্যাক্সের বিধান রেখেছে। সম্প্রতি সব কিছুকে ছাড়িয়ে ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরের বাজেটে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি সহ প্রদেয় সামগ্রিক অর্থের উপর ৭.৫% ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি এ বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ হিসাবে পত্রিকায় বিবৃতি দেয় ও পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে সমিতি ক্রমান্বয়ে অর্থমন্ত্রী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাননীয় অর্থ উপদেষ্টার সাথে সংলাপ করে ভ্যাট প্রত্যাহারের আবেদন জানায়। সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আশু কামনায় দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে আবেদন রাখেন।
বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও ট্রাস্টি আইন দ্বারা পরিচালিত। মূলত: বোর্ড অব ট্রাষ্টিজকে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সম্পূর্ণ তহবিল যোগানের জন্য দায়িত্ব নিতে হয়। যেহেতু সরকার থেকে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কোন প্রকার আর্থিক সহযোগীতা পায় না সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সকল ব্যয়ই নিজস্ব তহবিল হতেই মেটাতে হয়, তাছাড়া শিক্ষার্থীদের প্রদত্ত বেতন ও ফি হতে যা আদায় হয় তা দিয়ে অনেকাংশ ব্যয়ই নির্বাহ করা কষ্টসাধ্য।
পৃথিবীর কোন দেশে শিক্ষার্থীর উপর ভ্যাট রয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।  বরং শিক্ষা উন্নয়নে বিবিধ ভর্তূকী প্রদানই প্রতিষ্ঠিত প্রথা। আমাদের দেশেও তদ্রুপ অবস্থা ছিল এবং বহুক্ষেত্রে এখনও সেটাই বিরাজ করছে। প্রথমে জনাব সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী থাকাবস্থায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বৃত্ত আয়ের উপর প্রথম বাণিজ্যিক হারে কর্পোরেট রেটে করারোপ করেন। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের দাবীর মুখে এই হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হলেও মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের উপর তার হার হচ্ছে শূন্য শতাংশ। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি এখনও এই করারোপ গ্রহন করেনি বরং এই কর আরোপের উপর দেন দরবার চালিয়ে যাচ্ছে । এ বিষয়ে সমিতি বর্তমান  অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিতের সহানুভূতি আকর্ষণে প্রচেষ্টা চালিয়েছে । বর্তমানে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোন ব্যয় খাত নেই যেখানে উৎসে কর শতকরা ৫ ভাগ থেকে মূসক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত আরোপ হয়নি। এমনকি বাড়ী ভাড়ার উপর যে মূসক বাড়ীর মালিকদের দেয়ার কথা কিংবা বিজ্ঞাপনের উপর যে মূসক বিজ্ঞাপন প্রচারকের দেওয়ার কথা সেটাও কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এসব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের বোঝা কোন না কোন ভাবে শিক্ষার্থীদের উপর পড়ছে। এর আগে ২০১০ সালে সরকার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি এর উপর ৪.৫% ভ্যাট আরোপ করেছিল। যা পরবর্তীতে বিক্ষোভ ও ছাত্র আন্দোলনের মুখে এস.আর.ও. দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাহার করে নেয়। তাই ভ্যাট শিক্ষার জন্য যেমন অনাকাংখিত তেমনি স্থিতিশীলতা ও দেশের অগ্রগতির জন্য অনভিপ্রেত।
তাই আমাদের দাবী
১) ২০১০ সালের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করা কিংবা এগুলোর উপর কর বা ভ্যাট আরোপের কোন অবকাশ নেই। কেননা আইনটির ৪৪ ধারায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়কে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানই রাখা হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা ট্রাষ্ট এ্যাক্ট দ্বারা পরিচালিত বিধায় করারোপের ক্ষেত্রও সম্ভাবনা সম্পূর্ণ রূপে তিরোহিত হয়েছে।
২) আরোপিত কর ও ভ্যাট প্রকৃতপক্ষে যারা নিজেদের শিক্ষার ব্যয় নিজে বহন করছেন তাদের উপরেই অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত অধিকারের পরিপন্থি। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় যদি ভ্যাটযোগ্য হয় তাহলে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্তৃক আদায়কৃত টিউশনের অর্থও ভ্যাটযোগ্য হওয়ার কথা। তাই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষায় ভ্যাট আরোপ বৈষম্যমূলক আচরণ এবং দেশের সংবিধানের পরিপন্থি বলেই গণ্য হবে।
এই বৈষম্যমূলক ভ্যাট বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে এবং উচ্ছ শিক্ষার অগ্রগতিকে ব্যহত করবে।  আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ-আয়ের দেশে নিতে উচ্চ-শিক্ষার হার বাড়াতে শিক্ষায় করারোপ নয়, বরং ভর্তূকি দেয়া বাঞ্ছনীয় বলে সমিতি মনে করে।

NO COMMENTS

Leave a Reply